দেবদাস

প্রথম পরিচ্ছেদ

একদিন বৈশাখের দ্বিপ্রহরে রৌদ্রেরও অন্ত ছিল না, উত্তাপেরও সীমা ছিল না। ঠিক সেই সময়টিতে মুখুয্যেদের দেবদাস পাঠশালা-ঘরের এক কোণে ছেঁড়া মাদুরের উপর বসিয়া, শ্লেট হাতে লইয়া, চক্ষু চাহিয়া, বুজিয়া, পা ছড়াইয়া, হাই তুলিয়া, অবশেষে হঠাৎ খুব চিন্তাশীল হইয়া উঠিল; এবং নিমিষে স্থির করিয়া ফেলিল যে, এই পরম রমণীয় সময়টিতে মাঠে মাঠে ঘুড়ি উড়াইয়া বেড়ানোর পরিবর্তে পাঠশালায় আবদ্ধ থাকাটা কিছু নয়। উর্বর মস্তিষ্কে একটা উপায়ও গজাইয়া উঠিল। সে শ্লেট-হাতে উঠিয়া দাঁড়াইল।

পাঠশালায় এখন টিফিনের ছুটি হইয়াছিল। বালকের দল নানারূপ ভাবভঙ্গী ও শব্দসাড়া করিয়া অনতিদূরের বটবৃক্ষতলে ডাংগুলি খেলিতেছিল। দেবদাস সেদিকে একবার চাহিল। টিফিনের ছুটি সে পায় না-কেননা গোবিন্দ পণ্ডিত অনেকবার দেখিয়াছেন যে, একবার পাঠাশালা হইতে বাহির হইয়া পুনরায় প্রবেশ করাটা দেবদাস নিতান্ত অপছন্দ করে। তাহার পিতারও নিষেধ ছিল। নানা কারণে ইহাই স্থির হইয়াছিল যে এই সময়টিতে সে সর্দার-পোড়ো ভুলোর জিম্মায় থাকিবে।

এখন ঘরের মধ্যে শুধু পণ্ডিত মহাশয় দ্বিপ্রাহরিক আলস্যে চক্ষু মুদিয়া শয়ন করিয়াছিলেন এবং সর্দার-পোড়ো ভুলো এক কোণে হাত-পা ভাঙ্গা একখণ্ড বেঞ্চের উপর ছোটখাটো পণ্ডিত সাজিয়া বসিয়াছিল এবং মধ্যে মধ্যে নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সহিত কখন বা ছেলেদের খেলা দেখিতেছিল, কখন বা দেবদাস এবং পার্বতীর প্রতি আলস্য-কটাক্ষ নিক্ষেপ করিতেছিল। পার্বতী এই মাসখানেক হইল পণ্ডিত মহাশয়ের আশ্রয়ে এবং তত্ত্বাবধানে আসিয়াছে। পণ্ডিত মহাশয় সম্ভবতঃ এই অল্পসময়ের মধ্যেই তাহার একান্ত মনোর ন করিয়াছিলেন, তাই সে নিবিষ্টমনে, নিরতিশয় ধৈর্যের সহিত সুপ্ত পণ্ডিতের প্রতিকৃতি বোধোদয়ের শেষ পাতাটির উপর কালি দিয়া লিখিতেছিল এবং দক্ষ চিত্রকরের ন্যায় নানাভাবে দেখিতেছিল যে, তাহার বহু-যত্নের চিত্রটি আদর্শের সহিত কতখানি মিলিয়াছে। বেশী যে মিল ছিল তাহা নয়; কিন্তু পার্বতী ইহাতেই যথেষ্ট আনন্দ ও আত্মপ্রসাদ উপভোগ করিতেছিল।

এই সময় দেবদাস শ্লেট-হাতে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং ভুলোর উদ্দেশে ডাকিয়া বলিল, অঙ্ক হয় না।

ভুলো শান্ত গম্ভীরমুখে কহিল, কি আঁক?

মণকষা-

শেলেটটা দেখি-

ভাবটা এই যে, তাহার নিকট এ-সব কাজে শ্লেটখানি হাতে পাওয়ার অপেক্ষা মাত্র। দেবদাস তাহার হাতে শ্লেট দিয়া নিকটে দাঁড়াইল। ভুলো ডাকিয়া লিখিতে লাগিল যে, এক মণ তেলের দাম যদি চৌদ্দ টাকা নয় আনা তিন গণ্ডা হয়, তাহা হইলে-

এমনি সময়ে একটা ঘটনা ঘটিল। হাত-পা-ভাঙ্গা বেঞ্চখানার উপর সর্দার-পোড়ো তাহার পদমর্যাদার উপযুক্ত আসন নির্বাচন করিয়া যথানিয়মে আজ তিন বৎসর ধরিয়া প্রতিদিন বসিয়া আসিতেছে। তাহার পশ্চাতে একরাশি চুন গাদা করা ছিল। এটি পণ্ডিত মহাশয় কবে কোন্ যুগে নাকি সস্তা দরে কিনিয়া রাখিয়াছিলেন, মানস ছিল, সময় ভাল হইলে ইহাতে কোঠা-দালান দিবেন। কবে যে সে শুভদিন আসিবে তাহা জানি না। কিন্তু এই শ্বেত-চূর্ণের প্রতি তাঁহার সতর্কতা এবং যত্নের অবধি ছিল না। সংসারানভিজ্ঞ, অপরিণামদর্শী কোন অলক্ষ্মী-আশ্রিত বালক ইহার রেণুমাত্র নষ্ট না করিতে পারে, এইজন্য প্রিয়পাত্র এবং অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ভোলানাথ এই সযত্ন-সঞ্চিত বস্তুটি সাবধানে রক্ষা করিবার ভার পাইয়াছিল এবং তাই সে বেঞ্চের উপর বসিয়া ইহাকে আগুলিয়া থাকিত।

ভোলানাথ লিখিতেছিল-এক মণ তেলের দাম যদি চৌদ্দ টাকা নয় আনা তিন গণ্ডা হয়, তাহা হইলে,-ওগো বাবা গো-তাহার পর খুব শব্দ-সাড়া হইল। পার্বতী ভয়ানক উচ্চকণ্ঠে চেঁচাইয়া হাততালি দিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল। সদ্যঃনিদ্রোত্থিত গোবিন্দ পণ্ডিত রক্তনেত্রে একেবারে উঠিয়া দাঁড়াইলেন; দেখিলেন, গাছতলায় ছেলের দল একেবারে সার বাঁধিয়া হৈহৈ শব্দে ছুটিয়া চলিয়াছে, এবং তখনি চক্ষে পড়িল যে, ভগ্ন বেঞ্চের উপর একজোড়া পা নাচিয়া বেড়াইতেছে এবং চুনের মধ্যে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হইতেছে। চীৎকার করিলেন, কি-কি-কি রে!

বলিবার মধ্যে শুধু পার্বতী ছিল। কিন্তু সে তখন ভূমিতলে লুটাইতেছে এবং করতালি দিতেছে। পণ্ডিত মহাশয়ের বিফল প্রশ্ন ক্রুদ্ধভাবে ফিরিয়া গেল, কি কি-কি রে!

তাহার পর শ্বেতমূর্তি ভোলানাথ চুন ঠেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। পণ্ডিত মহাশয় আবার চীৎকার করিলেন, গুয়োটা তুই!-তুই ওর ভেতর!

অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-

আবার!

দেবা শালা-ঠেলে-অ্যাঁ-অ্যাঁ-মণকষা-

আবার গুয়োটা!

কিন্তু পরক্ষণেই সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়া লইয়া, মাদুরের উপর উপবেশন করিয়া প্রশ্ন করিলেন, দেবা ঠেলে ফেলে দিয়ে পালিয়েচে?

ভুলো আরো কাঁদিতে লাগিল-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-

তাহার পর অনেকক্ষণ ধরিয়া চুন ঝাড়াঝাড়ি হইল, কিন্তু সাদা এবং কাল রঙে সর্দার-পোড়োকে কতকটা ভূতের মত দেখাইতে লাগিল এবং তখনও তাহার ক্রন্দনের নিবৃত্তি হইল না।

পণ্ডিত বলিলেন, দেবা ঠেলে ফেলে পালিয়েচে? বটে?

ভুলো বলিল-অ্যাঁ-অ্যাঁ-

পণ্ডিত বলিলেন, এর শোধ নেব।

ভুলো কহিল,-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-

পণ্ডিত প্রশ্ন করিলেন, ছোঁড়াটা কোথায়-

তাহার পর ছেলেদের দল রক্তমুখে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ফিরিয়া আসিয়া জানাইল, দেবাকে ধরা গেল না। উঃ-যে ইঁট ছোঁড়ে-!

ধরা গেল না?

আর একজন বালক পূর্বকথার প্রতিধ্বনি করিল-উঃ-যে-

থাম বেটা-

সে ঢোক গিলিয়া একপাশে সরিয়া গেল। নিষ্ফল-ক্রোধে পণ্ডিতমশাই প্রথমে পার্বতীকে খুব ধমকাইয়া উঠিলেন; তাঁহার পর ভোলানাথের হাত ধরিয়া কহিলেন, চল্, একবার কাছাড়িবাড়িতে কর্তাকে বলে আসি।

ইহার অর্থ এই যে, জমিদার নারায়ণ মুখুয্যের নিকট তাঁহার পুত্রের আচরণের নালিশ করিবেন।

তখন বেলা তিনটা আন্দাজ হইয়াছিল। নারায়ণ মুখুয্যেমশায় বাহিরে বসিয়া গড়গড়ায় তামাক খাইতেছিলেন এবং একজন ভৃত্য হাতপাখা লইয়া বাতাস করিতেছিল। সছাত্র পণ্ডিতের অসময় আগমনে কিছু বিস্মিত হইয়া কহিলেন, গোবিন্দ যে!

গোবিন্দ জাতিতে কায়স্থ-ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া ভুলোকে দেখাইয়া সমস্ত কথা সবিস্তারে বর্ণনা করিলেন। মুখুয্যেমশায় বিরক্ত হইলেন; বলিলেন, তাইত, দেবদাস যে শাসনের বাইরে গেছে দেখচি!

কি করি, আপনি হুকুম করুন।

জমিদারবাবু নলটা রাখিয়া দিয়া কহিলেন, কোথা গেল সে?

তা কি জানি? যারা ধরতে গিয়েছিল, তাদের ইঁট মেরে তাড়িয়েচে।

তাঁহারা দুইজনেই কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। নারায়ণবাবু বলিলেন, বাড়ি এলে যা হয় করব।

গোবিন্দ ছাত্রের হাত ধরিয়া পাঠশালায় ফিরিয়া গিয়া মুখ ও চোখের ভাবভঙ্গীতে সমস্ত পাঠশালা সন্ত্রাসিত করিয়া তুলিলেন এবং প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, দেবদাসের পিতা সে অঞ্চলের জমিদার হইলেও তাহাকে আর পাঠশালে ঢুকিতে দিবেন না। সেদিন পাঠশালার ছুটি কিছু পূর্বেই হইল; যাইবার সময় ছেলেরা অনেক কথা বলাবলি করিতে লাগিল।

একজন কহিল, উঃ! দেবা কি ষণ্ডা দেখেচিস!

আর একজন কহিল, ভুলোকে আচ্ছা জব্দ করেচে।

উঃ, কি ঢিল ছোঁড়ে!

আর একজন ভুলোর তরফ হইতে কহিল,-ভুলো শোধ নেবে দেখিস।

ইস্-সে ত আর পাঠশালায় আসবে না যে শোধ নেবে।

এই ক্ষুদ্র দলটির একপাশে পার্বতীও বই-শ্লেট লইয়া বাড়ি আসিতেছিল। সে নিকটবর্তী একজন ছেলের হাত ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, মণি, দেবদাদাকে আর পাঠশালায় সত্যি আসতে দেবে না?

মণি বলিল, না-কিছুতেই না।

পার্বতী সরিয়া গেল- কথাটা তার বরাবরই ভাল লাগে নাই।

পার্বতীর পিতার নাম নীলকণ্ঠ চক্রবর্তী। চক্রবর্তী মহাশয় জমিদারের প্রতিবেশী অর্থাৎ মুখুয্যে মহাশয়ের খুব বড় বাড়ির পার্শ্বে তাঁহার ছোট এবং পুরাতন সেকেলে ইঁটের বাড়ি। তাঁহার দু-দশ বিঘা জমিজমা আছে, দু-চার ঘর যজমান আছে, জমিদারবাড়ির আশা-প্রত্যাশাটা আছে,-বেশ স্বচ্ছন্দ পরিবার-বেশ দিন কাটে।

প্রথমে ধর্মদাসের সহিত পার্বতীর সাক্ষাৎ হইল। সে দেবদাসের বাটীর ভৃত্য। এক বৎসর বয়স হইতে আজ দ্বাদশবর্ষ বয়স পর্যন্ত তাহাকে লইয়াই আছে-পাঠশালায় পৌঁছিয়া দিয়া আসে এবং ছুটির সময় সঙ্গে করিয়া বাটী ফিরাইয়া আনে। এ কাজটি সে যথানিয়মে প্রত্যহ করিয়াছে এবং আজিও সেইজন্যই পাঠশালায় যাইতেছিল। পার্বতীকে দেখিয়া কহিল, কৈ পারু, তোর দেবদাদা কোথায়?

পালিয়ে গেছে-

ধর্মদাস ভয়ানক আশ্চর্য হইয়া বলিল, পালিয়ে গেছে কি রে?

তখন পার্বতী ভোলানাথের দুর্দশার কথা মনে করিয়া আবার নূতন করিয়া হাসিতে শুরু করিল,-দেখ্ ধম্ম, দেবদা-হি হি হি-একেবারে চুনের গাদায়-হি হি-হু হু-একেবারে ধম্ম চিৎ করে-

ধর্মদাস সব কথা বুঝিতে না পারিলেও হাসি দেখিয়া খানিকটা হাসিয়া লইল; পরে হাস্য সংবরণ করিয়া জিদ করিয়া কহিল, বল না পারু, কি হয়েচে?

দেবদা ঠেলে ফেলে দিয়ে-ভুলোকে-চুনের গাদায়-হি হি হি-

ধর্মদাস এবার বাকীটা বুঝিয়া লইল এবং অতিশয় চিন্তিত হইল; বলিল, পারু সে এখন কোথায় আছে জানিস?

আমি কি জানি!

তুই জানিস-বলে দে। আহা তার বোধ হয় খুব খিদে পেয়েচে।

তা ত পেয়েচে-আমি কিন্তু বলব না।

কেন বলবি নে?

বললে আমাকে বড় মারবে। আমি খাবার দিয়ে আসব।

ধর্মদাস কতকটা সন্তুষ্ট হইল-কহিল, তা দিয়ে আসিস, আর সন্ধ্যের আগে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাড়ি ডেকে আনিস।

আনব।

বাটীতে আসিয়া পার্বতী দেখিল, তাহার মা এবং দেবদাসের মা উভয়েই সব কথা শুনিয়াছেন। তাহাকেও এ কথা জিজ্ঞাসা করা হইল। হাসিয়া গম্ভীর হইয়া সে যতটা পারিল কহিল। তাহার পর আঁচলে মুড়ি বাঁধিয়া জমিদারদের একটা আমবাগানের ভিতর প্রবেশ করিল। বাগানটা তাহাদেরই বাটীর নিকটে, এবং ইহারই একান্তে একটা বাঁশঝাড় ছিল। সে জানিত, লুকাইয়া তামাক খাইবার জন্য দেবদাস এই বাঁশঝাড়ের মধ্যে কতকটা স্থান পরিষ্কার করিয়া রাখিয়াছিল। পলাইয়া লুকাইয়া থাকিতে হইলে ইহাই তাহার গুপ্তস্থান। ভিতরে প্রবেশ করিয়া পার্বতী দেখিল, বাঁশঝোপের মধ্যে দেবদাস ছোট একটা হুঁকা-হাতে বসিয়া আছে এবং বিজ্ঞের মত ধূমপান করিতেছে। মুখখানা বড় গম্ভীর-যথেষ্ট দুর্ভাবনার চিহ্ন তাহাতে প্রকাশ পাইতেছে। পার্বতীকে দেখিতে পাইয়া সে খুব খুশী হইল, কিন্তু বাহিরে প্রকাশ করিল না। তামাক টানিতে টানিতে গম্ভীরভাবেই কহিল, আয়।

পার্বতী কাছে আসিয়া বসিল। আঁচলে যাহা বাঁধা ছিল, তৎক্ষণাৎ দেবদাসের চক্ষে পড়িল। কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া সে তাহা খুলিয়া খাইতে আরম্ভ করিয়া কহিল, পারু, পণ্ডিতমশাই কি বললে রে?

জ্যাঠামশায়ের কাছে বলে দিয়েচে।

দেবদাস হুঁকা নামাইয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিল, বাবাকে বলে দিয়েচে?

হাঁ।

তারপর?

তোমাকে আর পাঠশালায় যেতে দেবে না।

আমি পড়তেও চাই না।

এই সময়ে তাহার খাদ্যদ্রব্য প্রায় ফুরাইয়া আসিল, দেবদাস পার্বতীর মুখপানে চাহিয়া বলিল, সন্দেশ দে।

সন্দেশ ত আনিনি।

তবে জল দে।

জল কোথায় পাব?

বিরক্ত হইয়া দেবদাস কহিল, কিছুই নেই, ত এসেচিস কেন? যা, জল নিয়ে আয়।

তাহার রুক্ষস্বর পার্বতীর ভাল লাগিল না; কহিল, আমি আবার যেতে পারিনে-তুমি খেয়ে আসবে চল।

আমি কি এখন যেতে পারি?

তবে কি এইখানেই থাকবে?

এইখানে থাকব, তারপর চলে যাব-

পার্বতীর মনটা খারাপ হইয়া গেল। দেবদাসের আপাত-বৈরাগ্য দেখিয়া এবং কথাবার্তা শুনিয়া তাহার চোখে জল আসিতেছিল,-কহিল, দেবদা, আমিও যাব।

কোথায়? আমার সঙ্গে? দূর-তা কি হয়?

পার্বতী মাথা নাড়িয়া কহিল, যাবই-

না,-যেতে হবে না-তুই আগে জল নিয়ে আয়-

পার্বতী আবার মাথা নাড়িয়া বলিল, আমি যাবই-

আগে জল নিয়ে আয়-

আমি যাব না-তুমি তা হলে পালিয়ে যাবে।

না-যাব না।

কিন্তু পার্বতী কথাটা বিশ্বাস করিতে পারিল না, তাই বসিয়া রহিল। দেবদাস পুনরায় হুকুম করিল, যা বলচি!

আমি যেতে পারব না।

রাগ করিয়া দেবদাস পার্বতীর চুল ধরিয়া টান দিয়া ধমক দিল-যা বলচি।

পার্বতী চুপ করিয়া রহিল। তারপর তাহার পিঠে একটা কিল পড়িল-যাবিনে?

পার্বতী কাঁদিয়া ফেলিল-আমি কিছুতেই যাব না।

দেবদাস একদিকে চলিয়া গেল। পার্বতীও কাঁদিতে কাঁদিতে একেবারে দেবদাসের পিতার সুমুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। মুখুয্যেমশাই পার্বতীকে বড় ভালবাসিতেন। বলিলেন, পারু, কাঁদচিস কেন মা?

দেবদা মেরেচে।

কোথায় সে?

ঐ বাঁশবাগানে বসে তামাক খাচ্ছিল।

একে পণ্ডিত মহাশয়ের আগমন হইতেই তিনি চটিয়া বসিয়াছিলেন-এখন এই সংবাদটা তাঁহাকে একেবারে অগ্নিমূর্তি করিয়া দিল। বলিলেন, দেবা বুঝি আবার তামাক খায়?

হাঁ খায়, রোজ খায়। বাঁশবাগানে তার হুঁকো নুকোন আছে-

এতদিন আমাকে বলিস নি কেন?

দেবদাদা মারবে বলে।

কথাটা কিন্তু ঠিক তাই নহে। প্রকাশ করিলে দেবদাস পাছে শাস্তি ভোগ করে, এই ভয়ে সে কোন কথা বলে নাই। আজ কথাটা শুধু রাগের মাথায় বলিয়া দিয়াছে। এই তাহার সবে আট বৎসরমাত্র বয়স-রাগ এখন বড় বেশী; কিন্তু তাই বলিয়া তাহার বুদ্ধি-বিবেচনা নিতান্ত কম ছিল না। বাড়ি গিয়া বিছানায় শুইয়া অনেকক্ষণ কাঁদিয়া-কাটিয়া ঘুমাইয়া পড়িল,-সে রাত্রে ভাত পর্যন্ত খাইল না।

তাহসান–রোজার বিচ্ছেদের নেপথ্যের কারণ কী

তাহসান ও রোজা। কোলাজ

ঠিক এক বছর আগে সবাইকে চমকে দিয়ে বিয়ের খবর জানান জনপ্রিয় গায়ক ও অভিনয়শিল্পী তাহসান রহমান খান। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রূপসজ্জাশিল্পী রোজা আহমেদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে নিয়ে সে সময় বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টানা কয়েক দিন ট্রেন্ডিংয়ে ছিল তাহসানের বিয়ের খবর। তবে বছর না ঘুরতেই এলো বিচ্ছেদের সংবাদ। গত শনিবার প্রথম আলোকে তাহসান নিজেই তাঁদের বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তাহসান বললেন, ‘আমাদের বিচ্ছেদের ঘটনা সত্য’

তাহসান খান

তাহসান খানছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

বিচ্ছেদের খবরে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তুমুল প্রেমের পর বিয়ে—তারপর এত দ্রুত সম্পর্কের সমাপ্তি কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে কৌতূহলী ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা। ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রেমের সময়ের তুলনায় দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে থাকার সময়টা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।

তাহসান–রোজার বিয়ে থেকে বিচ্ছেদ, এক বছরে যা যা হলো

জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় সংগীতসফরে যাওয়ার আগেই তাহসান ও রোজা আলাদা থাকছিলেন। সে সময় মেলবোর্ন থেকে তাহসান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন গান ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার কথা।

রোজা আহমেদ

রোজা আহমেদছবি : রোজার ইনস্টাগ্রাম

আমি চাই মানুষ আস্তে আস্তে আমাকে ভুলে যাক: তাহসান

গতকাল তাহসান জানিয়েছেন, ওই সময়েরও আগে থেকেই তাঁরা আলাদা ছিলেন। এরপর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আর প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে দেখা যায়নি তাঁকে। অন্যদিকে, রোজা বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাহসানের সঙ্গে তোলা ছবি ও আবেগঘন পোস্ট শেয়ার করেছেন। এতে অনেকের ধারণা ছিল, সম্পর্কটি এখনো টিকে আছে। তবে ঘনিষ্ঠজনেরা বলছেন, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

তাহসান খান

তাহসান খানছবি : প্রথম আলো

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাহসান ও রোজার ঘনিষ্টজনেরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর দুজনের জীবনদর্শন ও প্রত্যাশার জায়গায় কিছু পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাহসান চেয়েছিলেন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও নিরিবিলি জীবনযাপন করতে। সে কারণেই বিনোদন অঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষ্ক্রিয় করা—এমন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সংসারকেই দিতে চেয়েছিলেন অগ্রাধিকার।

অন্যদিকে, বিয়ের পর রোজার পরিচিতি ও সামাজিক পরিসর বেড়েছে। নতুন এই বাস্তবতাকে তিনি উপভোগ করছিলেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ভিন্ন ভিন্ন মানসিক অবস্থান ও জীবনযাপনের ধারা ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

তাহসান কি রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন

রোজা আহমেদ

রোজা আহমেদছবি : রোজার ইনস্টাগ্রাম

ঘনিষ্ঠ মহলের ভাষ্যমতে, শুরুতে এই দূরত্ব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হলেও একসময় মতের অমিল প্রকট হয়ে ওঠে। কাউকে দোষারোপ না করে, পারস্পরিক সম্মানের জায়গা থেকে সম্পর্কের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেন দুজনই। জানা গেছে, গেল বছরের শেষ দিকেই বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তাহসান বললেন, ‘আমাদের বিচ্ছেদের ঘটনা সত্য’

গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় সংগীতসফরে যাওয়ার আগেই তাহসান ও রোজা আলাদা থাকছিলেন

গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় সংগীতসফরে যাওয়ার আগেই তাহসান ও রোজা আলাদা থাকছিলেনকোলাজ

তাহসানের এটি দ্বিতীয় বিয়ে। আগের সংসারে তাঁর একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার সঙ্গে তিনি নিয়মিত সময় কাটান। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাহসান বরাবরই সংযত। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তিনি নীরবতাকেই বেছে নিয়েছেন।

ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, বিচ্ছেদ হলেও দুজনই বিষয়টি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সামলেছেন। সম্পর্ক জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই বলেই জানা গেছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়—বরং জীবন ও সম্পর্কের বাস্তবতায় ভিন্ন পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।

ট্রাম্প কেন ভেনেজুয়েলায় হামলা চালালেন এবং মাদুরোকে ‘আটক’ করলেন?

    • ভ্যানেসা বুশশ্লুইটার
    • Role,লাতিন আমেরিকা সম্পাদক, বিবিসি নিউজ অনলাইন
  • ৪ জানুয়ারি ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে।

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের পর মার্কিন এই অভিযানের ঘটনা ঘটল।

ভেনেজুয়েলা পরিচালনার ঘোষণা ট্রাম্পের

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটকের পর ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করার জন্য নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার-এ-লাগোসে দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাদের এখন নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখানে তারা আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি হবেন।

  • যুক্তরাষ্ট্র “ভেনেজুয়েলা ও তার নেতার বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরের হামলা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে”
  • মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে

“ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাবো,” বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বর্তমানে যারা রয়েছে, তাদের সরিয়ে দিয়ে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করার জন্য লোকজন মনোনীত করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

“প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে দ্বিতীয় দফায় আক্রমণের প্রস্তুতি রেখেছি আমরা,” বলেন তিনি।

বিশ্বকাপে নিরাপত্তা নিয়ে বিসিবিকে পাঠানো আইসিসির চিঠিতে কী বলা হয়েছে?

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার ইস্যুতে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ ‘তিনটি আশঙ্কা’র কথা জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বিসিবিও একটি বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ একটি যোগাযোগের অংশ ওই চিঠি।

সেই চিঠিটি বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে।

চিঠিটি মূলত একটি ইমেইল, যেটি আইসিসির সিকিউরিটি ম্যানেজার বা নিরাপত্তা বিভাগের ব্যবস্থাপক পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টাকে। মেইলটি পাঠানো হয়েছে ৮ই জানুয়ারি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এবং বাংলাদেশের সমর্থকরা ভারতে বিশ্বকাপে অংশ নিতে গেলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, মূলত সেটিই মেইলের বিষয়বস্তু। মেইলে বাংলাদেশ টিমের ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট সামারি’ বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে তার সারাংশ জানিয়েছেন আইসিসির সিকিউরিটি ম্যানেজার।

সাধারণত, আইসিসি যে কোনো আসর আয়োজনের ক্ষেত্রে এই ধরনের ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে থাকে, যেখানে পুরো আসরের আগে ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রতিটি ভেন্যুকে ঘিরে প্রতিটি দলের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই ঝুঁকি মূল্যায়নের পর সাধারণত প্রতিটি দলের জন্য প্রতিবেদন দেয়া হয়।

যা রয়েছে আইসিসির মেইলে

মেইলের শুরুতে তেসরা জানুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিতে বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা, নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভারতের বদলে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চাওয়ার দাবি এবং মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর চারটি বিষয়ে আলাদা করে বাংলাদেশ দলের ভারত সফরের ঝুঁকির মূল্যায়ন করা হয়েছে।

আলোনসোকে যেসব কারণে ছাঁটাই করল রিয়াল মাদ্রিদ

‘আজ যে কোচকে নিয়ে সমর্থকেরা উল্লাস করে তার অমরত্ব চাইছে, পরের রোববার সেই একই কোচকেই তারা মরতে বলবে’—ফুটবল কোচদের চাকরি নিয়ে ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইয়ে আক্ষেপ করে কথাটা লিখেছিলেন উরুগুয়ের বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো। বলা হয়, কোচদের বাক্স–পেটরা গোছানোই থাকে, কে জানে কখন আবার বিদায়ঘণ্টা বাজে! কোচের চাকরিতে নির্মম এই বাস্তবতা গতকাল রাতে হয়তো কঠিনভাবে উপলব্ধি করেছেন জাবি আলোনসো।

‘এলাম, দেখলাম এবং জয় করলাম’ ভঙ্গিতে কোচিং দুনিয়ায় জাবির আবির্ভাব, মাত্র সাত মাসের মাথায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব থেকে ছাঁটাই হয়ে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখলেন তিনি। বুঝলেন, কোচের চাকরি মানে কাঁটার মুকুট পরে ডাগআউটে দাঁড়ানোর বিয়োগান্ত এক গল্পও, যেখানে শেষটা বেশির ভাগ সময় হতাশা মোড়ানোই হয়। প্রশ্ন হলো, বায়ার লেভারকুসেনের মতো দলকে ইতিহাস গড়ে যিনি শিরোপা জিতিয়েছিলেন, তিনি রিয়ালে এসে কোথায় ভুল করলেন? যেখানে পরিবেশটা ছিল তাঁর কাছে হাতে তালুর মতো চেনা। নাকি খুব দ্রুতই তাঁকে ছাঁটাই করে অন্যায় করেছে রিয়াল?খেলোয়াড় হিসেবে আক্ষেপ বলে কোনো শব্দ নেই আলোনসোর প্রোফাইলে। বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ সম্ভাব্য যা যা জিততে পারতেন সবই জিতেছেন তিনি। অবসর নিয়েছেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে। এরপর নেমেছেন কোচিংয়ে। রিয়াল সোসিয়েদাদের বি দল দিয়ে শুরু করে ২০২২ সালে দায়িত্ব নেন লেভারকুসেনের।পরের গল্পটা রীতিমতো রূপকথা! আলোনসোর লেভারকুসেনের দায়িত্ব নেওয়ার সময়টাও একেবারে পক্ষে ছিল না। সে সময় জেরার্দো সিওয়ানের অধীন ৮ ম্যাচের মাত্র ১টি জিতে অবনমনের শঙ্কায় কাঁপছিল বুন্দেসলিগার ক্লাবটি। এরপরও চ্যালেঞ্জটা নেন আলোনসো। অবনমন অঞ্চল থেকে লেভারকুসেনকে টেনে তোলেন লিগ টেবিলে ৬ নম্বরে। শুরুতে অনেকে এ অর্জনকে আকস্মিক চমক হিসেবে দেখলেও পরের মৌসুমে যা ঘটেছে, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

কখনো ট্রফি না জেতা লেভারকুসেন অপরাজিত থেকে বুন্দেসলিগার শিরোপাসহ ঘরোয়া ট্রেবল জেতে। ইউরোপা লিগে হার মানতে হয় ফাইনালে। সব মিলিয়ে বিস্ময়কর এক মৌসুম পার করেছিল আলোনসোর লেভারকুসেন। পরের মৌসুমে অবশ্য আর কোনো সাফল্য আসেনি। আর মৌসুম শেষে আলোনসো প্রত্যাশিতভাবে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে বিদায়ী কোচ কার্লো আনচেলত্তির স্থলাভিষিক্ত হন তিনি।রিয়ালে শুরুতেই আলোনসো বিতর্কে আসেন লুকা মদরিচকে বাদ দিয়ে। যেভাবে কিংবদন্তি মদরিচকে ক্লাব ছাড়তে হয়েছিল, তা অনেকের দৃষ্টিতে অন্যায়। এরপরও সবার দৃষ্টি ছিল মাঠের পারফরম্যান্সে। পরিসংখ্যান বলছে, আলোনসোর অধীন রিয়ালের পারফরম্যান্স একেবারে খারাপ ছিল না। ৩৪ ম্যাচে, ২৪ জয়, ৬ হার ও ৪ ড্র।। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বার্সেলোনায় ৩৪ ম্যাচ পর কোচ হান্সি ফ্লিকের পারফরম্যান্সও ছিল একই রকম। ফ্লিক পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া ‘ট্রেবল’সহ চারটি শিরোপা জিতেছেন। রিয়াল কি তবে একটু তাড়াহুড়াই করে বসল?এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ, রিয়ালে আলোনসোর সময়টা ছিল বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ। ম্যাচের ফলে যা দেখা যাচ্ছে এবং ফলের বাইরের চিত্রটা মোটেই এক রকম নয়। লেভারকুসেনে আলোনসো নিজের কোচিং–দর্শনে বাজিমাত করেছিলেন, রিয়ালে যেটা প্রায় ছিলই না। ম্যাচ জেতার জন্য আলোনসোকে নির্ভর করতে হয়েছে বিশেষ কোনো মুহূর্ত কিংবা বিশেষ কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত দক্ষতায়। আরও সহজ করে বললে কিলিয়ান এমবাপ্পের ওপর।

আলোনসোর পুরো সময়টাতে রিয়াল স্বরূপে খেলতে পেরেছেন শুধু এমবাপ্পেই। রদ্রিগো কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ বাকি তারকাদের প্রায় সবাই ঢাকা ছিলেন নিজেদের ছায়াতেই। এই খেলোয়াড়দের কাছ থেকে নিজেদের সেরাটা বের করে আনার মুনশিয়ানা দেখাতে পারেননি আলোনসো। ফলে দলগত ঐক্য ও কৌশলগত দর্শন সেভাবে ফুটেও ওঠেনি। বিশেষত ‘জাবিবল’ নামের যে কোচিং–দর্শনকে আলোনসো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, রিয়ালে তা শুধু খাতা–কলমেই রয়ে যায়। গত সাত মাসে রিয়ালের আলোনসোর কৌশল বেশ রহস্যময় এক ঘটনা হয়েই থাকবে।

এই নামগুলোই বড় দলের বিপক্ষে রিয়ালের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। পাশাপাপশি জয়ের পরিসংখ্যান যে সঠিক বার্তা দিচ্ছে না, তা–ও এখানে একরকম স্পষ্ট। বড় দলগুলোর বিপক্ষে রিয়ালের এমন ব্যর্থতার মূল কারণগুলোর অন্যতম নড়বড়ে রক্ষণ। আলোনসোর আক্রমণাত্মক ও হাইলাইন ডিফেন্সের ফুটবল বড় দলগুলোর বিপক্ষে বারবার ঝুঁকিতে ফেলেছে দলকে। এ ছাড়া প্রতি–আক্রমণেও বেশ ভুগেছে রিয়াল।

মাঠের এলোমেলো কৌশল ও পরিকল্পনার বাইরে রিয়ালের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোনসোর বোঝাপড়ার ঘাটতিও ছিল দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে আলোনসোর বিরোধ রিয়ালকে পুরো সময়ে ভুগিয়েছে। শুধু ভিনিসিয়ুসই নন, রিয়ালের বেশ কজন খেলোয়াড় আলোনসোর ওপর খুশি ছিলেন এমনকি অনেকেই ছাঁটাইয়ের পর আলোনসোকে বিদায়ী বার্তা পর্যন্ত দেননি। ক্লাব ছাড়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়াতেও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন আলোনসো। স্পেনের রেডিও লা কাদেনা সের জানিয়েছে, আলোনসো ছাঁটাই হওয়ার পর বলেছেন, ‘আপনি খেলোয়াড়দের হাতে এত ক্ষমতা দিতে পারেন না। ক্লাব যদি সব সময় খেলোয়াড়দের পক্ষ নেয়, তবে ড্রেসিংরুম পরিচালনা করা কঠিন।’ এ ছাড়া রিয়ালে নিজের গড়া দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ব্যর্থ হন আলোনসো। এটিও মাঠের লড়াইয়ে রিয়ালকে বেশ ভুগিয়েছে।নাজাবির ছাঁটাই হওয়ার আরেকটি বড় কারণ, দলকে ভবিষ্যৎ দেখাতে না পারা। মৌসুমের প্রথম শিরোপা লড়াইয়ে রোববার হেরে গেছে রিয়াল। গত মৌসুমে সব হারানো রিয়ালের জন্য এটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। এমনকি সামনে থাকা ট্রফিগুলোও যে রিয়াল জিততে পারে, সে আশাও দেখাতে পারেননি তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মোমেন্টাম হারানো নিশ্চিতভাবেই রিয়াল কর্তৃপক্ষকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল, যার শেষটা হয়েছে ক্লাব থেকে ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে।

আলোনসোর কোচিং ক্যারিয়ার অবশ্য কেবলই শুরু হয়েছে। আর এই পেশায় হুটহাট ছাঁটাইয়ের ঘটনা খুব অস্বাভাবিক কিছুও নয়। তবে যাঁরা আলোনসোর হাত ধরে রিয়ালে বিপ্লব দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁদের রিয়াল–আলোনসো জুটির পরিণতিটা হতাশাজনক এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।